ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলার বাজড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। “কামারগ্রাম কাঞ্চন একাডেমীতে” সুদীর্ঘ কাল শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থেকে আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, মরহুম মোঃ অলিয়ার রহমান, ২০০৩ইং সালের ০৯ নভেম্বর মৃত্যুবরন করেন। পেশাগত বিশাল সুনাম ও পরিচিতির পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় অত্র অঞ্চলের অন্যতম একজন সংগঠক ছিলেন। এ মহান শিক্ষক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ‘আলফাডাঙ্গা পেজ’ এর পক্ষ থেকে জানাই অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
Category
- আলফাডাঙ্গার গর্ব (10)
- ইতিহাস-ঐতিহ্য (3)
- প্রকৃতি ও পরিবেশ (3)
- আলফাডাঙ্গা পেজ (2)
- ভিডিও চিত্র (1)
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১৫
শিক্ষক মরহুম মোঃ অলিয়ার রহমান
কবি আশরাফ আলী খান
লেখক শফি চাকলাদার
কবি আশরাফ আলী খান (জন্ম ১৩০৮/১০ ভাদ্র, ২৭ আগস্ট ১৯০১, মৃত্যু ২রা অগ্রহায়ণ ১৩৪৬, ১৯ নভেম্বর ১৯৩৯) এখন বিস্মৃত এক নাম। কিন্তু তাঁর কবিতা-গান-গল্প-প্রবন্ধ আজও যখন পড়ি তখন মনে হবে তাঁর এ সকল অবদান বর্তমানের কথা বলছে। মানবতার কথা বলছে। আজ শতবর্ষ পরেও আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় মানবতার নামে যা চলছে সে কথা যেন কবি আশরাফ সেই শতবর্ষ পূর্বেই বলে গেছেন। নজরুলের মতো করেই। তাই কবি আশরাফকে মিনিয়েচার ফর্ম অব নজরুল বললেও অত্যুক্তি হবে না। তাঁর সুবিখ্যাত ‘কঙ্কাল’ কাব্য যেন নিষ্পেষিত সমাজব্যবস্থার বাস্তব ছবি। ‘কঙ্কাল’ প্রকাশ পেয়েছিল ১৩৪২-এ বর্তমানে চলছে ১৪২১। ৭৯ বছর পূর্বে সমাজের বৈষম্য বিভেদ লক্ষ্য করে কবি আশরাফ যা তুলে ধরলেন আজও কি তার সমাধান হয়েছে। বছর ব্যবধানে কৌশল বদলেছে- কবি আশরাফ যখন বলেন,
জীর্ণ দালান ধসে পড়ে যাক, খেদ নাহি এক রতি।
তাজমহলের একখানা ইট-তাও খসে যাওয়া ক্ষতি।
কিম্বা নজরুলের বাণীতে যে সত্য প্রকাশিত হয়-
বেতন দিয়াছ? চুপ রও যত মিথ্যাবাদীর দল!
কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল?
নজরুল এবং মিনিয়েচার ফর্ম অব নজরুল- কবি আশরাফের এই চরণগুলো সমাজব্যবস্থার ভারসাম্যহীনতার ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন। জীর্ণ দালানের সাথে তাজমহলের একটি ইট, ধনী-গরিবের দূরত্বকে স্পষ্ট আখরে বলতে পেরেছেন। আজও সভ্য জগতের মানুষ হয়েও আমরা মানুষের মূল্যায়ন তেমন বাস্তবতার নিরিখে তুলে ধরতে পারছি? পারছি না। কিম্বা নজরুলের বেতন প্রসঙ্গ নিয়ে যে দুটো চরণ পাই ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় পাই তাও তো অফিস-আদালত, কল-কারখানার বৈষম্য লক্ষ্য করেই কবি লিখতে পেরেছেন। আজও প্রতি ঈদের সময় বোনাস-ভাতা নিয়ে কত রকম অমানবিক আচরণ সমাজ লক্ষ্য করে থাকে। প্রতিবাদ হয়- গুলি-লাঠিচার্জ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে। বোনাস-ভাতা শ্রমিকের প্রাপ্য। দিতেও হবে। তবুও গড়িমসি, তালবাহানা। ঠিক সময়ে না দিয়ে দুদিন পরে দেয়া- বোনাস-ভাতা কম দেয়া- এগুলো যেন ধনীদের, মালিকদের অলিখিত আনন্দ। কবি আশরাফ জীর্ণ দালান আর তাজমহলের একটি ইট দিয়ে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য-বিভেদকে তুলে ধরেছেন। সেই আশি বছর আগেও মানুষের মূল্যায়ন যেভাবে হতো- বর্তমান প্রেক্ষিতেও তাই হয়ে চলেছে। শুধুমাত্র কৌশল প্রয়োগে তারতম্য। কবি আশরাফ তাই নিঃশেষ হয়ে যায়নি। বর্তমান সমাজব্যবস্থার বিভেদ-ভেদাভেদ বলে দেয় কবি আশরাফের মানবতার মূল্যায়নে ক্ষুরধার বাণীগুলোর প্রয়োজন এখনও রয়েছে। ‘কঙ্কাল’ কাব্যের ৪৩৯টি লাইনই মানবতার কথায় সমৃদ্ধ। সমাজের ভেদ-বিভেদ-ভ-ামি প্রতারণা, মানুষ ঠকানো ইত্যাদিকে অত্যন্ত সহজ-সরল শব্দালঙ্কারে সাজিয়ে অঙ্গুলি তুলে দেখিয়ে দিয়েছেন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এসব কি করে বাসা বেঁধে আছে। কবি আশরাফ ‘কঙ্কাল’ কাব্যে অনেক বৈষম্যের ছবি তুলে ধরেছেন যা বর্তমান আলোকিত এই আমাদের সমাজব্যবস্থায় এমন চিত্র কি আজও এখানে সেখানে লক্ষণীয় নয়?-
অন্ন দিয়া কে রাখিবে জীবন অন্তিম সময়েতে?
ডাস্টবিনে ওরা ফেলে দেয় তবু দুঃখীরে দেয় না খেতে।
মনে পড়ে আজ জুম্মা দিবস, ভিখারীর খোশরোজ
প্রতি হপ্তায় এই শুভদিনে ভিকারীরা পায় ভোজ
ধনীর অঙ্গনে তাই প্রাণপণে ছুটিলাম সেই দিকে
এক বেলা যদি খেতে পাই কিছু কটা দিন যাব টিকে
দেখিনু আসিয়া মেয়ে ও পুরুষ ভিকারী শ’তিন চারি
পদ্ম পাতার বাসন পাতিয়া বসিয়াছে সারি সারি
কানা, খোঁড়া, বোবা, কুষ্ঠ আজারে শতবিকৃত দেহ
কোনমতে আমি তাহাদের পাশে নিলাম করিয়া ঠাঁই
জঠর জ্বালায় তীর্থে আসিলে জাতি-ভেদ দেখা নাই।
আজও এই লাইনগুলো সমাজের এখানে সেখানে মুখপাত্র। আজও এমন দৃশ্য অহরহ দেখতে পাওয়া যায়। আর এগুলো আড়াল করতে নানান অসংলগ্ন কথাবার্তা সাজানো হয় প্রচারমাধ্যম কিছু আছে যেখান থেকে ছড়ানো হয়। বলা হয়, দেশে এখন আর না- খাওয়া মানুষ পাওয়া যাবে না। দেশ এখন এত এত মাথাপিছু আয় অথচ ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে ফেলে দেয়া খাদ্য সংগ্রহ করা তাহলে বন্ধ হয়নি কেন? কবি আশরাফের এই লাইনগুলো যেন চিরন্তনী সত্য বাক্য-সত্য কাব্য হয়ে থাকবে? কবি আশরাফের মানুষের প্রতি দরদ-ভালোবাসার কখনও কমতি ছিল না ‘কঙ্কাল’ কাব্য তাঁর জীবন-বৃত্তান্ত এটা অনেকেই বলে থাকেন কিন্তু তেমনটা ভাবলেও এই মহাকাব্যটি সকল মানুষের জন্য গাঁথা হিসেবে মূল্যায়ন অবশ্যই করা যেতে পারে। কবি আশরাফ এই কাব্যের অন্যত্র বলেন,-
ওরা ধনী ওরা হৃদয়বিহীন নাস্তিক পশু জানি,
পশে না ওদের বধির শ্রবণে আর্তের কাতরানি,
ওরা মানুষের রুজি কেড়ে নেয়- দেয় না কারেও রুজি
খোদা ভক্তেরা কোথায় বিরাজে বারেক দেখিবে খুঁজি;
কবি অপর একটি চরিত্র এই ‘কঙ্কাল’ কাব্যে বাস্তবতার নিরিখে তুলে ধরেছেন- এটা কাব্য নয় এমনটা তো সকল ইটে গড়া বাড়িতে অট্টালিকায় শোভা পায়-
ওগো মহারাজ তোমার কুকুর ফেলে দেয় যাহা রোজ,
তাতে হতে পারে আমার মতন তিনটি প্রাণীর ভোজ,
মানুষ মরিছে ক্ষুধার জ্বালায়- তুমি পুষিতেছ পাখি
পশু-পক্ষীরে কোরেছ স্বজাতি। মানুষেরে দূরে রাখি।
সাম্যের এই কবি আল্লাহর প্রতি যেমন বিশ্বাস রাখেন হিন্দুদের সৃষ্টিকর্তার উপরও সুন্দর কথা শ্রদ্ধার সাথে বলেন- ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল তার অগাধ-
বজ্র নিনাদে-উঠিল আওয়াজ আমার বুকের মাঝে
আল্লারে তুই খুঁজিস কোথায় দেকি বাহিরেতে রাজে?
মাটির ধরায় প্রতি ঘরে ঘরে জনমন ভগবান
আকাশে অথবা কল্পলোকেতে নহে নহে তার স্থান।
খোদা মানে খোদ, তোর খোদা সে যে তুই ছাড়া কেহ-নয়
তোরি হাতে তোর ভাঙ্গাগড়া ভাই কোরানেও তাই কয়
জ্ঞানের শরাব পান করি যাহা বহু শতাব্দী আগে
বুঝেছিল জ্ঞানী মনসুর তায় আজো সন্দেহ জাগে
সাধু সন্তান বনে-জঙ্গলে খুঁজিয়া কিরিছ কারে?
আপনারে যেই চিনিতে পারিবে, চিনিবে সে আল্লারে।
‘কঙ্কাল’ কাব্য তার নিজের রচিত বয়ান লিপি। আমরা জানি কবি আশরাফের জীবন বিরহ-মধুরে গড়া হলেও শেষ পর্যন্ত ট্রাজেডি বা বিয়োগান্ত পরিণতি। কখনোই যেন সুন্দর জীবনের সন্ধান হয়ে ওঠেনি তার জীবনে। বিশাল ট্যালেন্টেড অথচ নানান পারিবারিক ঝঞ্ঝাট তার সেই মেধাটুকুকে মসৃণ পথে নিয়ে যেতে পারেনি। এবার যে ঘটনাটি কবি তার কঙ্কাল-এ কাব্যরূপ দিয়েছেন তেমন ঘটনা দেশে যে একদম বিরল তা নয়। কাউকে এক সময় তার অভাব দূর করতে অনেক সাহায্য দেয়া হয়েছে কিন্তু যখন তার নিজের সাহায্যের দরকার তখন সেই মানুষটি সাহায্যের হাত বাড়ায়নি তেমনি এই ঘটনাটি ‘কঙ্কাল’ কাব্যের একটি অংশে সুন্দর বর্ণনায় ফুটিয়েছেন কবি। উদ্ধৃতিটুকু একটু বড় হলেও পড়–য়ারা এক নিমেষে পড়ে ফেলবেন উদ্ধৃতিটুকু-
করিলাম স্থির, যেতে হবে এক ধনী বন্ধুর বাড়ী,
যারে একদিন খাইয়েছি নিজ মুখের অন্ন কাড়ি;
আজ সে খুলেছে ব্যবসা বিরাট, হইয়াছে লাখপতি,
বন্ধুর কাছে ভিক্ষা মাগিলে বিশেষ কি হবে ক্ষতি।
করিনু বাহির শত তালি দেয়া পুরাতন চটি জোড়া,
যাহার পেরেকে ক্ষত হোয়ে হোয়ে চরণ হোয়েছে খোঁড়া;
বেলেঘাটা হোতে মেটিয়া বুরুজ-বারটি মাইল পথ,
ভীষণ রৌদ্রে একা চলিলাম বাহিয়া চরণ-রথ!
আমারে দেখেই বন্ধু সহসা বন্ধ করিয়া গান,
জোর কোরে তার হাসি মুখখানি লইলেন করি মøান;
সালাম করিয়া কহিনু- ‘বন্ধু, সংবাদ বলো কিবা।’
বন্ধু কহেন- ‘অন্ধজনের কি আর রজনী-দিবা।’
চলে না যে আর কায়-কারবার, গত ছয়মাস হোতে
একটি পয়সা বিক্রয় নাই, খাড়া আছি কোন মতে।
আসিয়াছ তুমি, ভালোই হয়েছে, ভেবেছিনু আজ ভোরে
তোমা হোতে গিয়া গুটিকয় টাকা আনিব কর্জ্জ কোরে!
আমি জিজ্ঞাসি- ‘কেন, কি হইল ব্যাঙ্কের টাকাগুলো।’
বন্ধু কহেন- ‘মিছামিছি কেন বাজে কথা সব তুলো?
পাগল হোয়েছ! ব্যাঙ্কের টাকা তুলিতে যাইব আমি
লাখ না পুরিতে! সে টাকা আমার প্রাণের চেয়েও দামী।’
মোর কানে আসে মরণের ডাক, বন্ধু ভাবেন- হায়!
বুঝিবা আমার ‘যক্ষের ধন’ একটুকু খসে যায়।’
আমরা লক্ষ্য করি এ দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যখন কেউ ইন্তেকাল করেন তখন এত এত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে থাকে যে, মনেই হবে না দিন যত এগোবে উচ্ছ্বাসও ধীরে ধীরে কমে আসতে আসতে প্রায় ভুলে যাবার উপক্রম হয়। আর আশরাফ আলী খান তো পঁচাত্তর বছর পূর্বে ইহলোক ত্যাগ করেছেন তাকে মনে রাখার প্রশ্নই আসে না। অথচ বলতেই থাকব অতীত ছাড়া বর্তমান গড়া মুশকিল। আমাদের সাহিত্যাঙ্গনের এমন ব্যবস্থার প্রতি তাই শ্রদ্ধাশীল হওয়া যায় না। আফিম খেয়ে এই ব্যক্তিত্বশালী, তেজস্বী কবির মৃত্যু হয়। ‘কঙ্কাল’ ছাড়া কবির প্রকাশিত গ্রন্থ গাজী আমানুল্লাহ, ভোরের কুহু, শেকোয়া, মোয়া- এছাড়া অসংখ্য প্রবন্ধ বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ পায়। ‘বেদুঈন’ পত্রিকার সম্পাদনা করায় কবি আশরাফ ‘বেদুঈন’ কবি হিসেবেও পরিচিতি লাভ করে। আশরাফ আলী খান তার ‘শেকোয়া’ গ্রন্থখানি উৎসর্গ করে বলেন, ‘বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলমের দরাজ-দস্তে-। কবি আশরাফ ষোল লাইনের কবিতা- উৎসর্গে বলেন-
‘শোক-হানা খৈয়ালী বিবির
ভয় না জানা দুষ্টু ছেলে
আর কতকাল ছুটবে পথে
বিদ্রোহেরই মশাল জ্বেলে?
এখানে আশরাফ-নজরুল বিষয়ের সুযোগে মনে ক্ষোভ জাগে যে, নজরুল কবি আশরাফ সম্পর্কে কখনো কিছু বলেননি। নজরুল তো নামী-অনামী অনেকের জন্যই উৎসর্গ-উৎসাহ জুগিয়েছেন কিন্তু এমন একজন শক্তিশালী কবির প্রতি কেন এমন উদাসীন থাকলেন, এটা বোধগম্য হয়নি কখনো।
আজকাল অনেক সুরকার পুরনো দিনের হারিয়ে যাওয়া কবিদের কবিতা উদ্ধার করে সুর করে গাইতে লক্ষ্য করি কিন্তু এই কবি আশরাফের ‘ভোরের কুহু’ গানের বইটি তাদের লক্ষ্যে পড়ে না। গোটা বারো গান রয়েছে সেখানে- ইসলামী গান, কীর্তনসহ রয়েছে অন্য আধুনিকও। বর্তমানের জন্যও গানগুলো উপযুক্ত- ‘আজান’ নামের একটি গানের শেষ অংশে পাই-
‘নিদ্রা হইতে নামাজ শ্রেষ্ঠ’
‘কর্মশ্রেষ্ঠ’ কন বেলাল
-তুমি বল ভাই
তুমি হেলাল-
‘নামাজ পড়িবে সারা দিন-রাতে/পাঁচটি বার
কর্মের ফাঁদে পাবে না সময়/দম নিবার;
মহান আল্লাহ আর আল্লার/শ্রেষ্ঠদান-/
কিম্বা কীর্তনে পাই- ‘দুর্গা খেমটা’ তে গাঁথা-
রাধা- চল চল চল, তোরা চল সখি চল
কলসে ভরিতে হক যমুনা কি জল ॥
এর থেকে স্পষ্টত উপলব্ধি করা যায় সঙ্গীতে তিনি যথেষ্ট জ্ঞান রাখতেন কারণ একাধারে তিনি ইসলামী গান লিখছেন, হিন্দুধর্মীয় গান লিখছেন, কোনো রাগে নিবদ্ধ তারও উল্লেখ করছেন। সুতরাং সঙ্গীতেও তিনি যে একজন সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন তা আর বলতে বাধা নেই। হোক না সঙ্গীত সংখ্যা স্বল্প। অনেকের কাছেই কবি আশরাফ ‘শেকওয়া’র কবি বলেই পরিচিত ছিলেন। ড. কবি ইকবাল-এর ‘জওয়াবে শেকওয়া’ ঠিক ঠিক অনুবাদ তারই হাতে হয়েছে। অনেকেই সমালোচনাও করেছেন তার অনুবাদে ত্রুটি ছিল। তথাপি তার অনুবাদই শ্রেষ্ঠ।
শেষ করব কবি আশরাফ সম্পর্কিত কিছু কথা বলে, কবি বন্ধু মোহাম্মদ কাসেম থেকে জানা যায় তারই ভাষায় উল্লেখ করছি- কবি ছিলেন- “দীর্ঘাকৃতি জোয়ান মর্দ। ইয়া চওড়া চিৎনা তার বুক, শক্ত মজবুত বাহু, সতেজ বলিষ্ঠ দেহ, খ্যাতি-চিহ্নিত তীক্ষè চোখ। বেপরওয়া বেদুঈন যেন।”
আশরাফ আলী খান-এর মৃত্যু বাংলার সাহিত্যাঙ্গনের এক করুন অধ্যায়। আশরাফ আলী খানকে যে সাহিত্যে অতি প্রয়োজন এটা মনে হয় তার জীবিত কালে উপলব্ধি হয়নি। কলকাতা শহরে স্ত্রী পোষ্যদের নিয়ে দুদিন একনাগাড়ে অনাহারে ছিলেন। ভাড়া অনাদায়ে তার কক্ষটি তালাবদ্ধ করে দেয়ায় অপমানে বেদনায় উদভ্রান্ত হয়ে আফিম খেয়ে আত্মহত্যা করলেন কবি। তার জীবনী থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি খানিকটা- বর্তমানের মানুষদের জানানোর লক্ষ্যে। কী করুণ মৃত্যু হয়েছিল তার উদ্ধৃতি পড়লেই জানা যাবে-
১৯৩৯ সালের ১৯ শে নবেম্বর, কলকাতার মীর্জাপুর স্ট্রিট দিয়ে হেঁটে চলেছেন কবি আশরাফ আলী খান ও তার এক ডাক্তার বন্ধু (ডা. আবদুল গনি)। কবি আশরাফ আলী ডাক্তার বন্ধুকে বলছেন, ‘আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালোই হলো। আমার এই লেখাগুলো আপনাকে দিয়ে যেতে চাই।’ ডাক্তার বন্ধুটি কিছুই বুঝতে না পেরে এবং কবিকে অপ্রকৃতিস্থ দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিছু খেয়েছেন কি?’ আশরাফ আলী খান বললেন, ‘হ্যাঁ, আফিম খেয়েছি।’ ডাক্তার বন্ধুটি যেন আসমান হতে পড়লেন। কিন্তু কি করবেন কিছুই ঠিক করতে পারলেন না। তিনি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। কিছু দূর এগুতেই জনৈক ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ করে আশরাফ আলী আবার এগিয়ে চললেন। ডাক্তার বন্ধুটি জিজ্ঞেস করলেন, ‘উনি কে? আশরাফ আলী বললেন, ‘উনি কবি মহীউদ্দিন।’ তখন উপায়ান্তর না দেখে ডাক্তার ভদ্রলোকটি কবি মহীউদ্দিনকে পেছন দিক হতে ডাকলেন এবং আশরাফ আলী যে আফিম খেয়েছেন তা তাকে বললেন। মহীউদ্দিন শুনে বললেন, ‘কি সর্বনেশে কথা, এখনও আপনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন।’ এই কথা বলে তিনি একখানা ট্যাক্সি ডাকলেন। আশরাফ আলী কিছুতেই যাবেন না। জোর করে তাকে ট্যাক্সিতে উঠানো হলো। এতক্ষণে বিষের ক্রীয়া পুরোপুরি শুরু হয়ে গিয়েছে। হাসপাতালে নেয়া হলো। কিন্তু বৃথা সব চেষ্টা। কিছুতেই কিছু হলো না। মৃত্যুর পূর্বে তিনি শুধু জানিয়ে গেলেন, ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেহই দায়ী নহে।’
প্রসিদ্ধ সাহিত্যিক- সাংবাদিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন এই প্রসঙ্গে লিখেছেন- “কবি আশরাফ আলী ক্ষুধার তাড়নায় আত্মহত্যা করেন। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা যখন ঘটে তখন কলকাতায় মুসলিম সাহিত্যিকমহল বিস্ময়ে ও শোকে চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। কবি আশরাফ আলী ছিলেন অত্যন্ত আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি। নিজের দুঃখ দারিদ্র্যের কথা অপরকে জানাতে অভ্যস্ত ছিলেন না তিনি। কয়েকদিন ক্ষুধার্ত থাকার পর তিনি আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার পূর্বে তিনি তার প্রায় সমস্ত বন্ধু-বান্ধবের সাথেই দেখা করেন। কিন্তু কাউকে ঘূর্ণাক্ষরেও জানতে দেন নাই তার সংকল্পের কথা। ‘আজাদ’ অফিসে গিয়ে তিনি আমার সাথে দেখা করেছিলেন এবং নানা বিষয়ে আলাপ আলোচনা করেছিলেন। আমি তখন কল্পনাও করতে পারি নাই যে, তিনি কয়েকদিনের অনাহারী। আমি তাঁকে এক কাপ চা খাইয়েছিলাম মাত্র। বিদায় নেবার সময় তিনি হঠাৎ একবার বলেছিলেন, “বুহ দোষ ত্রুটি হয়েছে, মাফ করবেন।” আমি অবশ্য বেশ একটু খানি বিস্মিত হয়েছিলাম। কিন্তু তিনি যে একেবারে শেষ বিদায় নিচ্ছেন এটা ধারণা করতে পারি নাই। পরদিন কাগজে তার আত্মহত্যার সংবাদ জেনে ক্ষোভে দুঃখে একবারে মুষড়ে পড়েছিলাম। কেন তিনি তার অনাহারের কথা জানালেন না, আমিই বা কেন তাকে মাত্র এক কাপ চা খাওয়ালাম, এই শ্রেণীর নানা চিন্তায় আমার মনটা খুবই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। বেশ কিছুদিন এই চিন্তা মন থেকে দূর করতে পারি নাই।” আশরাফ আলী খানকে তার বন্ধু-বান্ধব সমাহিত করেন কলকাতার গোবরা গোরস্থানে।
সাংবাদিক মাহফুজুর রহমান খান বলেন, “হাসি ও কান্নার এরূপ একত্র সমাবেশ খুব কম লোকের জীবনে দেখতে পাওয়া যায়।” কলকাতার ওয়েলিংটন স্কোয়ারের বিখ্যাত মসজিদের সংস্কার ও নির্মাণ সাধনের কাজে কবি আশরাফের সাহসী অবদান কখনো ভুলবার নয়। শ্রমিকের বন্ধু, মানবদরদী, উন্নত শির সেবক কবি আশরাফ আলী খান-এর প্রয়োজন আজও। ‘লোভের ফল’ শিশুদের জন্য এক অদ্বিতীয় ছন্দোময় কবিতা- এখনো অনেকেই কবিতাটির এই লাইনগুলো বলে থাকে-
চিনি ভেবে নুন/ দই ভেবে চুন
খায় কতোদিন/শ্রীমান রবিন
ভালো ছেলে যত/জেনো অবিরত
লোভ করিলেই/ফল তার এই ॥
কবি আশরাফ বলতেন ‘মানুষ চাই’। এই নামে তার বিখ্যাত একটি কবিতা রয়েছে ১১১ লাইনের প্রতিটি ছত্র প্রয়োজন। এমন কবিতা কেন পাঠ্য নয় স্কুল কলেজে সেটাই জিজ্ঞাসা-
বটের মতন বৃহৎ গাছে/শুধুই ফলে ক্ষুদ্র ফল
আনারস আর কুমড়া, কাঁকুড়/ক্ষুদ্র গাছেই হয় কেবল।
তোমরা যাদের ক্ষুদ্র জান/“বাপ তাড়ান মায়ের খেদানো”
তাদের মাঝেই মানুষ আছে/ধনীর ঘরে মানুষ নাই,
তাদের চাই/মানুষ চাই ॥
দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা থেকে সংগৃহীত
গীতিকার শামসুদ্দিন হাসু
আমাদের আলফাডাঙ্গা পেজের পক্ষ থেকে এই গীত শিল্পীর প্রতি রইল শুভেচ্ছা আর অভিনন্দন......আপনি আপনার গীত রচনার মাধ্যমে আমাদের সঙ্গীত অঙ্গন কে সমৃদ্ধ করুন এবং সেই সাথে আমাদের আলফাডাঙ্গার মুখ উজ্জল করুন মহান আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনা করি.........
সঙ্গীত গুরু তারাপদ দাশ
তিনি?
সঙ্গীত গুরু তারাপদ দাশ।
সঙ্গীত গুরু তারাপদ দাশ আলফাডাঙ্গায় জন্মগ্রহণ করেন একটি সাধারন পরিবারে।ছোট বেলা থেকেই সঙ্গীতের প্রতি ছিল তার বিশেষ আগ্রহ তাইত মাত্র ১৩ বছর বয়সে পাড়ি জমান ভারতে।সেখানে এক আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে একটি সঙ্গীত স্কুলে টানা আট বছর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের উপর দক্ষতা অর্জন করেন।
তৎকালীন সময়ে গ্রাম বা শহরের অন্যতম প্রধান বিনোদন মাধ্যম ছিল যাত্রাপালা। যাত্রা পালার তখন অনেক মর্যাদা ছিল। তারাপদ দাশ নিউ বাসন্তী অপেরা ও গণেশ অপেরার মতো বিখ্যাত সব যাত্রা দলে সঙ্গীত পরিচালক হিসাবে কর্ম জীবন শুরু করেন।বাংলাদেশের খ্যাতিমান অভিনেতা প্রয়াত অমল বোস এই নিউ বাসন্তী অপেরার সাথে যুক্ত ছিলেন।
পরবর্তীতে যখন “যাত্রা” মাধ্যম টিতে ভাটা পড়ে তখন গ্রামে এসে সঙ্গীত শিক্ষক হিসাবে শিক্ষা দান শুরু করেন।পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনেও গান পরিবেশন করেছেন।
আলফাডাঙ্গা,বোয়ালমারী,কাশিয়
এসব যায়গায় শিক্ষকতার কারণে তারাপদ স্যারের নিকট থেকে বর্তমান সময়কার অনেক প্রতিভাবান সঙ্গীত শিল্পীদের সঙ্গীতের হাতে খড়ি নেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ বর্তমান সময়কার সঙ্গীত শিল্পী ন্যান্সি তার বাবার কর্মসূত্রে ছোটবেলায় আলফাডাঙ্গায় পড়াশুনা করেছেন।ন্যান্সির তারাপদ স্যারের নিকট থেকেই সঙ্গীতের হাতেখড়ি হয়।টিভিতে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ন্যান্সি স্মৃতিচারণ করেছেন গুরু তারাপদ দাশকে।
এছাড়াও আলফাডাঙ্গার ডাঃ সুকুমার কুণ্ডু,খুলনা বেতারের শিল্পী রুপা সাহা,কাশিয়ানীর জগলুল হায়দার শাহীন সহ অনেক নাম না জানা শিল্পী ছড়িয়ে রয়েছেন সারা বাংলাদেশ জুড়ে।
এই মানুষটি সারাজীবন বিলিয়েছেন সুরের পুস্প
জীবনের রং অতি সাধারনে রাঙালেও সঙ্গীত জীবনের রঙ বিন্দুমাত্র ফ্যাঁকাসে হতে দেন নি।
আজ তারাপদ স্যার আমাদের মাঝে নেই তারপরেও তিনি আছেন তার হাতে গড়া শিল্পীদের সুর-সঙ্গীতের ঝংকারে।
তিনি থাকবেন গানের ভেলায়......
সকাল বেলায় তাঁর কোন ছাত্র বা ছাত্রী যখন “ভীম পলশ্রী” রাগের উপর কোন সঙ্গীত রেওয়াজ করেন হয়ত তিনি শুনতে পান ওপাড়ে বসেই......
তথ্য ও ছবি সংগ্রহে –
সাজ্জাদ সাজু,শুভংকর পাল,সুজন দাশ(তারাপদ স্যারের বড় ছেলে)
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)



