বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০১৫

কবি রত্ন এম.এ.হক

প্রতিভা বিকাশের জন্য অথবা প্রতিভা-পরিচিতির জন্য প্রতিভাবানের ভৌগোলিক অবস্থান হয়ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু সেটি একটি সাময়িক ব্যাপার। কারণ প্রতিভার কোনো দেশ-প্রদেশ-ভূগোল নেই। কবিরত্ন এম.এ.হক এর একটি প্রজ্বলন্ত উদাহরণ। তিনি ১৯২৯ সালের ১ জানুয়ারি সাবেক যশোর, বর্তমান ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলার ব্যাংকেরচর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।ভূগোলের বিবেচনায় নিঃসন্দেহে এটি প্রান্ত; যাকে বলে প্রত্যন্ত অঞ্চল। কিন্তু সেই প্রান্ত থেকেই তিনি কেন্দ্রের ভাবকে লালন করে, আবার প্রান্তের ভাবকে কেন্দ্রে তুলে ধরে কেন্দ্র ও প্রান্তের ভেদ ঘোচাতে চেষ্টা করেছেন। সাহিত্যিক, সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী হিসেবে তিনি ফরিদপুর জেলায় স্বনামখ্যাত ছিলেন। কামারগ্রাম কাঞ্চন একাডেমি থেকে ১৯৪৮ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে তিনি খুলনা বি.এল. কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজ থেকে ১৯৫০ সালে আই.এ. পাস করে একই কলেজে বি.এ. শ্রেণিতে ভর্তি হন। কিন্তু বি.এ. ডিগ্রি লাভের আগেই তিনি শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। নিজ এলাকায় তিনি যুক্তিবাদী, পণ্ডিত, শিক্ষানুরাগী এবং 'কবি সাহেব' নামে সমধিক পরিচিত। তিনি একাধিক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা। জীবনে বহুবার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক এবং গুণীজন হিসেবে সংবর্ধিত হয়েছিলেন কবিরত্ন এম.এ. হক।

কবিরত্ন এম এ হক প্রান্তে থেকেই স্বীয় প্রতিভাবলে কেন্দ্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন জসীমউদ্দীন এবং বিখ্যাত সনেটকার সুফী মোতাহের হোসেনের অত্যন্ত স্নেহভাজন। জসীমউদ্দীন এবং সুফী মোতাহের হোসেন ছিলেন তাঁর সাহিত্যের গুণমুগ্ধ পাঠক ও অনুপ্রেরণা দাতা। তাঁর কাব্য-প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে জসীমউদ্দীন ও সুফী মোতাহের হোসেন স্বেচ্ছা-প্রণোদিত হয়ে এম.এ.হকের 'এপার-ওপার' গ্রন্থটির ভূমিকা লিখে দেন। কবিরত্ন এম.এ.হকের সাহিত্য-প্রতিভা ছিল বহুমুখী। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, গীতিকার, প্রাবন্ধিক, ছড়াকার এবং গল্পকার। তাঁর রচিত নাতিদীর্ঘ গ্রন্থতালিকা থেকে তাঁর সাহিত্য-প্রতিভার বৈচিত্র্য অনুমান করা যেতে পারে— 'শুকতারা' (কাব্যগ্রন্থ), 'পথদিশারু' (কাব্যগ্রন্থ), 'এপার-ওপার' (লোকগানের সংকলন), 'কচি মনের খোরাক' (পাকিস্তান আমলে প্রাথমিক স্কুল পর্যায়ে দ্রুত পঠন হিসেবে যশোর শিক্ষাবোর্ডে পাঠ্য ছিল), 'দরেদ নবী' (ইসলামী গান), 'হক-বচন', 'ছন্দ-বন্ধ-বাগধারা' (গ্রন্থটিতে অপ্রচলিত এবং হারাতে বসা অসংখ্য বাগধারাকে তিনি সংকলিত করেন এবং স্কুল-ছাত্রছাত্রীদের উপযোগী করে ছন্দে বাক্য রচনা করেন), 'দেশের গান' (দেশাত্মবোধক গানের সংকলন), 'দাদুর ছড়া' (শিশু-সাহিত্য), 'স্মৃতিকথা' (মুনীর চৌধুরী, ডক্টর এনামুল হক, কবি শাহাদাত্ হোসেন, সৈয়দ আলী আহসান, বিজয় সরকার, কবি আশরাফ আলী খান প্রমুখের সঙ্গে কবির ব্যক্তিগত স্মৃতি নিয়ে রচিত), 'কাঙ্গাল পথিক' (কাব্যগ্রন্থ) এবং 'মুক্তির গান' (সুফি মতবাদী কবিতা)।

কবিরত্ন এম.এ.হক তাঁর সৃজনকর্মের মধ্যে লোকজীবনের অন্তরতলকে যেমন তাঁর সাহিত্যের উপজীব্য করেছিলেন, তেমনি আধুনিকতাকেও উপলব্ধির আওতায় আনতে পেরেছিলেন। ইসলামী গান, লোকগান, আধুনিক গান এবং কবিতার সফল পাশাপাশি অবস্থান তাঁর প্রতিভার বৈচিত্র্যকে করেছে প্রকাশিত। এম.এ.হকের কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে 'যশোর-সাহিত্য-সংঘ' তাঁকে 'কবিরত্ন' উপাধিতে ভূষিত করে। এছাড়া 'যশোরের লোক কবি', 'ফরিদপুরের কবি পরিচিতি' গ্রন্থে তাঁর কবিতা ও জীবনী গ্রন্থিত হয়েছে। প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ সম্পাদিত এবং সাবেক বাংলা উন্নয়ন বোর্ড থেকে প্রকাশিত 'বাংলাদেশের কবি পরিচিতি' গ্রন্থে কবিরত্নের নাতিদীর্ঘ জীবনী গ্রন্থিত হয়েছিল। বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত 'চরিতাভিধান'-এ কবিরত্নের জীবন ও তাঁর কৃতিত্ব ভুক্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কবিরত্ন এম.এ.হক ২০০৬ সালের ১৩ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।

লেখক-কুদরত-ই হুদা মেহেদী
ইত্তেফাক পত্রিকা

সংগ্রহ ও ছবি সম্পাদনায়
Shuvongkar Shuvo
Admin of Alfadanga page

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন